জমির নামজারি (মিউটেশন) খরচ ও আবেদন প্রক্রিয়া ২০২৬ — সম্পূর্ণ গাইড

জমির নামজারি (মিউটেশন) খরচ ও আবেদন প্রক্রিয়া ২০২৬ — সম্পূর্ণ গাইড

কোন ফি কত, কী কী কাগজ লাগবে, আর ঘরে বসে কীভাবে অনলাইনে আবেদন করবেন — ধাপে ধাপে

নামজারি (মিউটেশন) কী এবং কেন প্রয়োজন?

জমি হস্তান্তর হলে — কেনাবেচা, উত্তরাধিকার, দান বা বণ্টন যে কারণেই হোক — সরকারি খতিয়ানে পুরনো মালিকের নাম বাদ দিয়ে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে নামজারি বা মিউটেশন বলে। বাংলাদেশে একে সাধারণ কথায় জমি খারিজ করাও বলা হয়। শুধু দলিল থাকলেই জমির পূর্ণ আইনি মালিকানা নিশ্চিত হয় না — সরকারি রেকর্ডেও নাম না উঠলে ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, ব্যাংক লোনের জন্য বন্ধক রাখা বা ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করতে সমস্যায় পড়তে হয়।

নামজারির সরকারি ফি — সম্পূর্ণ তালিকা (২০২৬)

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নামজারির জন্য সর্বমোট নির্ধারিত ফি ১,১৭০ টাকা — এর বেশি কেউ দাবি করলে সেটা অনিয়ম। প্রতিটি ভূমি অফিসে এই ফি তালিকা প্রকাশ্যে সাইনবোর্ডে টাঙানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

কোর্ট ফি২০ টাকা
নোটিশ জারি ফি৫০ টাকা
রেকর্ড সংশোধন / হালনাগাদ ফি১,০০০ টাকা
খতিয়ান সরবরাহ ফি১০০ টাকা
সর্বমোট১,১৭০ টাকা

এই চারটি ফি ছাড়াও আলাদাভাবে সার্টিফাইড খতিয়ান (পর্চা) কপি নিতে চাইলে ১২০ টাকা এবং মৌজা ম্যাপ নিতে চাইলে প্রতি শিটে প্রায় ৫৪৫-৫৫০ টাকা সরকারি ফি প্রযোজ্য (ডাকযোগে নিলে অতিরিক্ত ডাকমাশুল যুক্ত হবে)।

নামজারির জন্য কী কী কাগজপত্র লাগবে?

  • মূল দলিলের কপি (সাফ কবলা / হেবা / বণ্টননামা — যেভাবে জমি পেয়েছেন সে অনুযায়ী)
  • পূর্ববর্তী খতিয়ানের কপি (CS, SA, RS বা BS খতিয়ান)
  • ওয়ারিশ সনদ (উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে)
  • সর্বশেষ ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের দাখিলা
  • আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)

অনলাইনে নামজারির আবেদন করার ধাপ

  1. ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করুন
    land.gov.bd অথবা সরাসরি mutation.land.gov.bd ওয়েবসাইটে গিয়ে মোবাইল নম্বর দিয়ে অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
  2. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে প্রস্তুত রাখুন
    উপরে উল্লেখিত সব কাগজের স্পষ্ট স্ক্যান কপি বা ছবি হাতের কাছে রাখুন, আবেদনের সময় আপলোড করতে হবে।
  3. আবেদন ফরম পূরণ করুন
    জমির মৌজা, খতিয়ান নম্বর এবং তফসিল সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করুন। একাধিক খতিয়ান হলে কমা বা সেমিকোলন দিয়ে আলাদা করুন।
  4. প্রিভিউ যাচাই করে দাখিল করুন
    জমা দেওয়ার আগে প্রিভিউ ভালোভাবে দেখে নিন — একবার দাখিল হয়ে গেলে আর সংশোধনের সুযোগ থাকে না। দাখিলের পর আবেদন নম্বরসহ পেজটি সেভ ও প্রিন্ট করে রাখুন।
  5. অনলাইনে ফি পরিশোধ করুন
    কোর্ট ফি ও নোটিশ জারি ফি (মোট ৭০ টাকা) আবেদনের সময়ই অনলাইনে পরিশোধ করতে হয়। অনুমোদনের পর রেকর্ড সংশোধন ও খতিয়ান সরবরাহ ফি (১,১০০ টাকা) পরিশোধ করবেন।
  6. শুনানির তারিখে উপস্থিত থাকুন বা অপেক্ষা করুন
    প্রয়োজনে সহকারী কমিশনার (ভূমি) শুনানির জন্য ডাকতে পারেন। কোনো আপত্তি না থাকলে সাধারণত অনলাইনেই অনুমোদন হয়ে যায়।
  7. ডিসিআর ও নতুন খতিয়ান সংগ্রহ করুন
    অনুমোদনের পর QR কোডযুক্ত অনলাইন ডিসিআর ও খতিয়ান ডাউনলোড বা সংগ্রহ করতে পারবেন — land.gov.bd থেকে QR স্ক্যান করে এর সত্যতাও যাচাই করা যায়।

নামজারি করতে কত দিন সময় লাগে?

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গড়ে প্রায় ২০ দিনের মধ্যেই বেশিরভাগ নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে, যেখানে আগে এই প্রক্রিয়ায় কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগত। তবে আবেদনে ভুল থাকলে বা আপত্তি উঠলে সময় বেশি লাগতে পারে।

সতর্কতা — দালাল ও বাড়তি টাকা দাবি এড়িয়ে চলুন

নামজারির জন্য সর্বমোট ১,১৭০ টাকার বেশি কেউ দাবি করলে সেটা অনিয়ম। পুরো প্রক্রিয়া নিজে ঘরে বসেই অনলাইনে করা সম্ভব, তাই কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে করার প্রয়োজন নেই। বাড়তি টাকা দাবি করা হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস বা জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

নামজারি করতে সর্বমোট কত টাকা লাগে?
সরকার নির্ধারিত ফি অনুযায়ী নামজারির জন্য সর্বমোট ১,১৭০ টাকা লাগে (কোর্ট ফি ২০, নোটিশ জারি ৫০, রেকর্ড সংশোধন ১,০০০ ও খতিয়ান সরবরাহ ১০০ টাকা)।
দলিল রেজিস্ট্রি করার পর কত দিনের মধ্যে নামজারি করতে হয়?
নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক সময়সীমা না থাকলেও, দলিল রেজিস্ট্রির পর যত দ্রুত সম্ভব নামজারির আবেদন করা উচিত, কারণ এটি না করলে জমির পূর্ণ আইনি মালিকানা ও খাজনা পরিশোধ নিশ্চিত হয় না।
নামজারি কি সম্পূর্ণ অনলাইনে করা যায়?
হ্যাঁ, বর্তমানে নামজারি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল — land.gov.bd বা mutation.land.gov.bd ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই আবেদন ও ফি পরিশোধ করা যায়।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির নামজারিতে অতিরিক্ত কী লাগে?
উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পেলে সাধারণ কাগজপত্রের পাশাপাশি ওয়ারিশ সনদ জমা দিতে হয়।
নামজারি অনুমোদনের পর কী পাওয়া যায়?
অনুমোদনের পর QR কোডযুক্ত অনলাইন ডিসিআর এবং নতুন খতিয়ান পাওয়া যায়, যার সত্যতা land.gov.bd থেকে QR কোড স্ক্যান করে যাচাই করা যায়।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: এই ফি ও প্রক্রিয়া সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী লেখা হয়েছে, তবে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে land.gov.bd বা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নিন।

তথ্যসূত্র: ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন (dhakapost.com, risingbd.com, khoborsangjog.com) অনুযায়ী হালনাগাদ করা।

শেয়ার করুন:

Comments